অস্তিত্ব
অস্তিত্ব
লেখকঃ রোকনুজ্জামান রিপন
শীতল ঘরের তরল হিলিয়াম আস্তে আস্তে কমে আসছে।হিলিগ্রো মিটারের কাটা তরতর করে নেমে যাচ্ছে নিচে।অক্সিমিটারের কাটা ক্রমন্বয়ে ৩০ এর ঘর পেরিয়ে ৪০ এসে দাড়িয়েছে।আর কিছুক্ষন বাদেই জেগে উঠবে মহাকাশ যান ফিনিক্স ২৯ এর সকল যাত্রী।পৃথিবীর হিসাবে ১২০ বছর পর ঘুম ভাঙছে সবার।আরো ৭০০ বছর পর ঘুম ভাঙার কথা ছিল সবার।নিশ্চই যান্ত্রিক কোন গোলযোগ দেখা দিয়েছে যার জন্য মহাকাশ যানের কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ক্লোরা জাগিয়ে তুলেছে সকল ঘুমান্ত যাত্রীদের।ক্যাপস্যুলের পুরু কাচের ভেতরে আস্তে আস্তে চোখের পাতা মেল্ল লিরা।একটা মিষ্টি বেলিফুলের কোমল ঘ্রাণের সাথে ভোতা এক ধরনের অবসাদ এসে ভর করেছে।মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা নিউরনে হিমগ্লোবিনে ভর করে ছুটে চলেছে অক্সিজেন। জেগে উঠছে হাইপোথ্যালামাস।বেশ ঠান্ডা লাগছে ওর।দাতে দাত ঠুকে যাওয়ার মত ঠান্ডা। এখনো পুরো দেহ সচল হয়ে ওঠেনি।ক্যাপসুলের পুরু মনিটরে বডি স্টুমুলেটরিতে ১০ শতাংশ লাল আলোয় ভরে উঠেছে।এর মানে ওর জানা।মস্তিষ্ক সচল হতে শুরু করেছে।অল্পক্ষনের মধ্যেই সমস্ত দেহ জেগে উঠবে।আবার চেখ বন্ধ করে নিল লিরা।ভাবতে চেষ্টা করল সুখময় কোন স্মৃতির কথা।আস্তে আস্তে সচল হয়ে উঠল সমগ্র দেহ।চোখের সামনে থেকে নেমে গেল ঘোলাটে কাচের আবরন।তার যায়গায় ঝুকে আছে লির উদ্বিগ্ন পাংশু মুখ।লির মুখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে উঠলো লিরার।চোখে ভেসে উঠলো সূর্য্য নামক নক্ষত্রের একটা ময়াময়ী নীলচে গ্রহের কথা।১৫ বিলিয়ন বছর আগে বিগব্যাঙের ফলে তৈরি হয়েছিল পৃথিবী নামক ঐ গ্রহটা।প্রানের বিকাশ ঘটেছিল অত্যান্ত দ্রুত।লিরা বড্ড ভালবাসতো পৃথিবী নামক ঐ গ্রহটাকে।ভাবতেই কষ্ট লাগছে সেই গ্রহটা আজ আর নেই।ধ্বংশ হয়ে গেছে তার সমস্ত প্রাণ বৈচিত্র।১০০ বিলিয়ন মেগাপার্সেক সক ওয়েভ রেডিয়েশনে চুরমার করে দিয়েছে সৌর জগৎ।ভেঙে পড়েছে ওজন স্তর।মানুষের অপব্যাবহারে দূষিত হয়েগিয়েছিল পৃথিবীর বায়ুমন্ডল।আর্টিফিশিয়াল নোবেল গ্যাস দিয়ে মেরামত করা হয়েছিল ওজন স্তর।বাইরে বেরুতে গেলে পরতে হত সিনথেটিক পারসোনাল প্রটেকশন ইকুয়েপমেন্ট।তবুও সেই দূষিত,নোংরা পৃথিবীর জন্য মনটা হুহু করে উঠলো লিরার।মহাবিশ্ব থেকে চিরতরে বিলিন হয়ে যাচ্ছিল মানুষের অস্তিত্ব।নিজেদের অস্তিত্বকে মহাবিশ্বে টিকিয়ে রাখতে ১০ হাজার হিমায়িত ভ্রুন আর ১০০ জন নারী পুরুষকে তুলে দেওয়া হয় মহাকাশযানে।তৈরি করা হয় সপ্তম পর্যায়ের সুপার কম্পিউটার ক্লোরা।মানুষের বসবাসের উপযোগী গ্রহের সন্ধান পেলে জাগিয়ে তুলবে সকল ঘুমন্ত যাত্রীকে।আবার তৈরি হবে নতুন পৃথিবীতে নতুন সভ্যতা।কিন্তু এক্ষুনি কেন জাগিয়ে তোলা হল বুঝতে পারছেনা লিনা আর লি।লি হাত বাড়ায় লিনার দিকে।ক্যাপাসুল থেকে বেরিয়ে আসে লিনা।ঠিক তখনি নিক্কন মেয়েলি কন্ঠে ভেসে ভেসে এল শীতল ঘরের ছাদ ফুড়ে,মহামান্য লি এবং মহামান্য লিনা আপনাদের জাগিয়ে তোলার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। মহাকাশযানে একটা বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।আমাদের মহাকাশযান ক্রাশ হতে চলেছে।পৃথিবী ধ্বংশকারী সেই ১০০ বিলিয়ন পার্সেক সক ওয়েভ ছুটে আসছে আমাদের দিকে।আমরা প্রবল বেগে ছুটে চলেছি একটা নিউট্রনো স্টারের দিকে।পৃথিবী ছেড়ে আমরা ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চলে এসেছি।কিন্তু সেই সকওয়েভকে পিছু ছাড়া করতে পারিনি।এই ১২০ বছরে ৪৯ বার এমন বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।প্রতিবার আমি জাগিয়ে তুলেছি একজোড়া করে মানব মনবীকে।কেননা মহকাশযানের বিপদজনক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বুদ্ধিমত্তা স্কেলে ৮ এর উপরে কোন মানুষের কমান্ডের প্রয়োজন। এই সক ওয়েভের হাত থেকে বাঁচতে ২ টা কাজ করা যায়,প্রথমতো এন্টিসকওয়েভ ফায়ার করে সক ওয়েভ ডেস্ট্রয় করা।আর দ্বিতীয়ত হাইপারড্রাইভ দিয়ে সময়ের গন্ডি পেরিয়ে যাওয়া।যা অত্যান্ত বিপদজনক।আমাদের থ্রি ডাইমেনশনাল টাইম থেকে যদি ভিন্ন কোন ডাইমেনশনে হাইপারড্রাইভ দেওয়া হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বিষ্ফরনে ডেস্ট্রয় হয়ে যাবে আমাদের মহাকাশযান।তার সাথে সাথে মহাবিশ্ব থেকে বিলিন হয়ে যাবে মানুষের অস্তিত্ব।প্রতিবার সবাই বেছে নিয়েছেন এন্টিসকওয়েভ ফায়ারিং। যাতে অন্ততপক্ষে কয়েক বছর পিছিয়ে পড়ে এই সক ওয়েভ।কিন্তু সমস্যা দেখাদিয়েছে হিমোলাইসিস ফ্যাক্টর নিয়ে।মানুুষের লোহিত রক্তকনিকার প্রতি ১০০ গ্রামে হিমগ্লোবিন আছে ১৫ গ্রাম।যার ১৫ ভাগের ১ ভাগ আছে আয়রন বা লোহা।সকওয়েভ প্রতি ইলেকট্রন আল্ট্রা ম্যাগনেটিক রিয়াকশনের ফলে প্রবল বেগে আকর্ষণ করে লোহার ইলেকট্রনকে।যার ফলে ফায়ারিং স্কোয়াডে বিষ্ফরন ঘটে মানব দেহের। এখন এই পুরো মহাকাশযানে কেবল মাত্র জীবিত প্রাণি আছেন আপনারা দুজন।এতগুলো কথা বলে থামলো মহাকাশযানটির কেন্দ্রিয় কম্পিউটার ক্লোরা।
সঙ্গে সঙ্গে কোন কথা বলতে পারেনা ওরা দুজন।সমস্ত পৃথিবী জুড়ে বুদ্ধিমত্তা স্কেলে ৮ এর ঘরে মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা।তাদের ভেতরে বাছাই করা ১০০ জনকে পাঠানো হয়েছিল এই ফিনিক্স মহাকাশযানে। আসন্ন মৃত্যকে সামনে রেখে কি গভীর আবেগে পৃথিবীবাসিরা তাকিয়ে ছিল উড়ন্ত ফিনিক্সের দিকে।টলমলে চোখে কল্পনা করেছিল নতুন পৃথিবীতে তাদেরি অনাগত বংশধর আবার গড়ে তুলবে সভ্যতা।তারা আর দূষিত করবেনা তাদের নতুন পৃথিবীকে।ভাবতে ভাবতে সক ওয়েভে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল সকলের দেহ।ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল স্বাধের পৃথিবী।ধ্বংশ হয়ে গিয়েছিল সৌর জগৎ।কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন কি আগলে রাখতে পারবে লি আর লিরা।কি করবে এখন।নিরাবতা ভেঙে আবার কথা বলে ওঠে কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ক্লোরা। আপনাদের হাতে সময় আছে ১৫০ ঘন্টা। তারপর মুখমুখি হতে হবে বিধ্বংসী সকওয়েভের।বেছে নিতে হবে অনিবার্য মৃত্যুর এন্টি সকওয়েভক ফায়ার অথবা হাইপারড্রাইভ।
তারপর বেশ কিছুক্ষন শব্দহীন হয়ে পড়ল মহাকাশযান ফিনিক্স। নৈসর্গিক নিরাবতা আলিঙ্গন করে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ আলোকবর্য বেগে ছুটে চলেছে অসিম অন্ধকারে।নিঃসঙ্গ অন্ধকার কেমন আপন ভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে মহাবিশ্বের একদল দূর্বল স্বাধীনচেতা প্রাণিদেরকে। নিরাবতা ভেঙে লিরা বল্ল,আচ্ছা ক্লোরা তুমি আগের ৯৮ জনকে সাবধান করনি যে এন্টি সকওয়েভ ফায়ার করলে তাদের অনিবার্য মৃত্যুর কথা।
ক্লোরা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,হ্যা সাবধান তো অবশ্যই করেছি।
কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলো লিরা,ওরা তখন কি বলেছিল?
তাদের সবার একটাই প্রশ্ন ছিল,আমাদের মৃত্যুর পরেও এই ভ্রুন গুলোকে অন্য একটা পৃথিবীতে নিয়ে যাওয়ার অনেক মানুষ থাকবে তাইনা?
আমি হ্যা বল্লে ওরা বলতো তাহলে আমাদের মৃত্যুটা বড় প্রয়োজন। আমাদের অনাগতদের জন্য আমাদের মৃত্যুটা খুব দরকার।তারপর তারা চুপ হয়ে যেত।এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো শীতল ঘরের হিমায়িত ভ্রুন গুলোর দিকে।আমি লক্ষ করেছি তখন সবার চোখ ভরা অশ্রু থাকতো কিন্তু ঠোঁটে থাকতো হাসি। আমার প্রগ্রামে আছে মানুষ দুঃখ পেলে কাদে আর আনন্দে হাসে।কিন্ত আমার এনালাইটিক্যাল কপোট্রন কোন ভাবেই বুঝতে পারেনা মানুষের কোন অনুভূতি প্রকাশের জন্য একই সাথে কান্না হাসির প্রয়োজন হয়।
মুহুর্তকাল চুপ করে থাকে ওরা।ক্লোরা সবুজ পিটপিটে কপোট্রনিক চোখ দিয়ে অবাক হয়ে দেখে যে ওদের দুজনের চোখেই পানি।কি অদ্ভুত! কি অদ্ভুত!
হলোগ্রাফিক স্কিনে পৃথিবীর একটা জিবন্ত চিত্র ভেসে বেড়াচ্ছে।যদিও আজ আর সেই নীল গ্রহটার কোন অস্তিত্ব নেই বিশ্ব মন্ডলে।পৃথিবীর অনেক সৌন্দর্য এভাবে আটকা পড়ে আছে ক্লোরার যান্ত্রিক মনে।হুকুম দিলেই শূন্যস্থানে ভেসে ওঠে হলোগ্রাফিক চিত্র। হলোগ্রাফিক স্কিনে পুরনো পৃথিবীর বসন্ত কালের একটা চলন্ত ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে।অলস দৃষ্টতে সেদিকে চেয়ে আছে লি।স্কিনে একটা পাহাড়ি ঝর্ণায় গোসল করছে গোটা আষ্টেক সদ্য আঠার পেরুনো যুবক যুবতী।ঠিক এমন একটা স্মৃতি আছে লির জীবনেও।ঐ যে ছেলেটা ডুবে যাচ্ছে তার পিছু ডুবসাঁতারে আরেকটা কে যেন।হটাৎ তাকে চিনতে পারে লি।স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া ছেলেটা ও নিজ।ও প্রবল স্রোতে যখন ভেসে যাচ্ছিল তখন সাতার না জানা মিরা ও লাফিয়ে পড়ে ওকে বাঁচাতে।সে কি প্রবল ঢেউ।ঢক ঢক করে গিলে ফেলেছিল স্বচ্ছ জল।মাথার মধ্যে চক্কর দিয়ে উঠতে চাইছিল বার বার।পাথরের সাথে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ডাঙায় ওঠে দুজন।তখনো পুরপুরি সজ্ঞানে ছিল দুজনেই। লির একটা হাত ভেঙেছিল। আর মিরা!ওর লান্স ফেটে রক্ত উঠছিল মুখ দিয়ে।প্রচণ্ড ব্যাথায় কুকড়ে যাওয়ার কথা।কিন্তু ওর চোখে মুখে ছিল আনন্দ।যেন অপ্রত্যাশিত কিছু হটাৎ পেয়ে বসেছে।খুব বেশি কথা বেরোইনি ওর রক্তভেজা মুখ দিয়ে।ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলেছিল ভা-ল-বা-সি।তারপরে আার ভাবতে পারেনা লি।ওর চোখের সামনেই নিথর হয়ে গিয়েছিল মিরা।কাজল আঁকা সুন্দর চোখ দুটো অবর্ণনীয় আনন্দ নিয়ে চেয়ে ছিল ওর দিকে।কিন্তু হলোগ্রাফিক স্কিনে কিভাবে এলো সে দৃশ্য?নিশ্চই ক্লোরা স্কান করেছে ওর নিউরন।ওর স্মৃতিকেই তুলে ধরছে ওর সামনের হলোগ্রাফিক স্কিনে। প্রবল আতঙ্কে চেঁচিয়ে ওঠে লি।প্লিজ স্টপ দিস,বলে চোখ বন্ধ করে নেয় সে।সঙ্গে সঙ্গে ইথারে মিলিয়ে গেল হলোগ্রাফিক স্কিন।মেথিলিনের নরম পর্দা ঠেলে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকলো লিরা।আতঙ্কিত কন্ঠে বল্ল কি হয়ছে?
সামনে দাঁড়ানো লিরার উদ্বিগ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে হটাৎ থমকে গেল লি।ঐ চোখ ওর চেনা।এক শতাব্দীর ও আরো আগের এক জোড়া চেনা চোখ।লির অস্ফুট কন্ঠে বেরিয়ে এলো,মিরা!
লিরা অবাক কন্ঠে বল্ল,আমি লিরা।কি হয়ছে তোমার?
নিজেকে সামলে নিল লি।পাংশু মুখে হাসি ফুটিয়ে বল্ল,কিছু না।দূঃস্বপ্ন দেখেছি।
লিরা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে বসলো মেথিলিনের খাটে।মলিন বদনে জানতে চাইলো,কিছু কি ভাবলে?
কি ভাববো? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লো লি।
লিরা বল্ল,সকওয়েভের ব্যাপারে?এই মহাবিশ্বে জিবিত মানুষ বলতে আছি আমরা দুজন।আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে চিন্তে।তা না হলে মানুষের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে চিরদিনের মত।শেষের দিকে মেয়েটার কন্ঠটা কেমন ভারি শোনালো।
এক মুহুর্তে কোন কথা বলতে পারেনা লি।নিরাবতা ভাঙলো কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ক্লোরা। মহামান্য লি এবং লিরা, এই মাত্র আমাদের মিনিগাল টেলিস্কোপে আশ্চর্য একটা গ্রহের সন্ধান মিলেছে।যার সাথে আমাদের পৃথিবীর কোন পার্থক্য নেই।সূর্যের মত একটা নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।
লি কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলো,গ্রহটা আর কতদূরে?
ক্লোরার যান্ত্রিক কন্ঠে ভেসে এলো,৩বিলিয়ন আলোকবর্য। আমাদের যেতে সময় লাগবে আরো ৩ শ বছর।
দপ করে নিভে গেল ওদের মুখের উজ্জ্বলতা।কাপাকাপা কন্ঠে লিরা বল্ল,সে তো অনেকটা সময়।এরমধ্যে এই ভয়ংকর সকওয়েভের মুখোমুখি হতে হবে অন্ততপক্ষে আরো ১০০ বার।
সম্মতি সূচক শব্দ করল ক্লোরা। আবার নিরাবতা নেমে এলো মহাকাশ জুড়ে।
আচ্ছা ক্লোরা আমরা যদি হাইপারড্রাইভ দিই তবে কতটা সময় সাশ্রয় হবে?বল্ল লি।
সঙ্গে সঙ্গে কথা বল্লনা ক্লোরা। বেশ খানিকটা পরে বল্ল,এক একটা হাইপারড্রাইভে আমরা ১.৭ শত আলোকবর্য অতিক্রম করব।কিন্তু ম্যাগনেটিক রিএ্যাকশনে ০.২ শত আলোকবর্য পেছনে ফিরে আসবো।আমরা যদি সফল ভাবে দুইটা হাইপারড্রাইভ সম্পন্ন করতে পারি তবে মাত্র কয়েক বছরেই পৌছে যাব নতুন পৃথিবীতে। কিন্তু মহামান্য লি,হাইপারড্রাইভে যদি আমরা ত্রিমাতৃক সময়কে অতিক্রম করি তবে অ্যানাইহিলিশন রে ডেস্ট্রয় করে দেবে এই মহাকাশযান।আজো পর্যন্ত একটাও হাইপারড্রাইভ ত্রিমাতৃক জগৎ থেকে ত্রিমাতৃক জগতে দেওয়া সম্ভাব হয়নি।আমাদের হাইপারড্রাইভ সফল ভাবে সম্পদনের সম্ভবনা ০.০০০১ পার্সেন্ট।থামলো ক্লোরা।
লি আবার জিজ্ঞেস করল আর আমরা যদি হাইপারড্রাইভ না দিয়ে এন্টিসকওয়েভ ফায়ারিং করি তবে আমাদের বেচে থাকার সম্ভবনা কতটুকু।
ক্লোরা সঙ্গে সঙ্গে জানালো জিরো পার্সেন্ট। কেননা ফায়ারিং করার সাথে সাথেই ধ্বংশ হয়ে যাবেন আপনারা।আবার নিরাবতা নামলো সমস্ত ঘর জুড়ে।দুজন দুজনের দিকে তাকালো।সে দৃষ্টি প্রাণশূন্য নয়।সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ওরা।হাইপারড্রাইভ দেবে ওরা।
ওদের দুজনের চোখের ভাষা একমুহুর্তে বুঝে নিল ক্লোরা। যান্ত্রিক কন্ঠে বল্ল,মহামান্য লি হাইপারড্রাইভ দিয়েও আমরা সকওয়েভকে ফাঁকি দিতে পারব কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।নতুন পৃথিবীটাও হয়তো ধ্বংশ করে দেবে এই বিধ্বংসী সক ওয়েভ।
এক মুহুর্ত চুপ করে থাকে লি।তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলে,তবুও আমরা হাইপারড্রাইভ দেব।
দুই,
ফিনিক্সের কাচ ঢাকা জানালা দিয়ে দূরে অন্ধকারে তাকিয়ে আছে লি।ওর হাতে আধখোলা অবস্থায় ধরা বহু পুরনো একটা বই।বিংশ শতাব্দীতে লেখা বইটা দশ হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল হার্ডিক্স ল্যাবরেটরিতে।প্রতি পদার্থ নিয়ে বেশ কিছু যুক্তি আছে বইটিতে।পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক ইলেক্ট্রনের জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করতে গিয়ে সেখানে আইনস্টাইনের থিওরী অব রিলেটিভিটি ব্যবহার করে ১৯ শতকের মাঝের দিকে সর্বপ্রথম ইলেক্ট্রনের প্রতি-পদার্থের অস্তিত্বের কথা ধারণা করেছিলেন। ভদ্রলোক ইলেক্ট্রনের এ প্রতি-পদার্থের নাম দেন “পজিট্রন”। এবং এর পরের বছর কার্ল এন্ডারসন সত্যি সত্যি পজিট্রন আবিষ্কার করে বসেন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে পল ডিরাকের অনুমানই সত্যি। ইলেক্ট্রন আর পজিট্রন পরস্পরের সংস্পর্শে আসা মাত্রই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদের সমস্ত ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই শক্তির পরিমাণ হচ্ছে E=mc^2।
অর্থাৎ পৃথিবীর প্রত্যেটা পদার্থের একটা করে এন্টি কপি হওয়ার কথা।যে পদার্থ একে অন্যের সংস্পর্শে এলেই ধ্বংশ হয়ে শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যাবে।হটাৎ করে বিদ্যুৎ চমকের মত একটা চিন্তা মাথায় আসে লির।সব কিছু পরিষ্কার হয়ে আসে ওর কাছে।অদৃশ্য শত্রুকে যেন সহসা চিনতে পারে লি।
নিঃছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে মহাকাশযান ফিনিক্স।স্বচ্ছ কাচে ঢাকা জানালার বাইরে বহু আলোকবর্য দূরের নিউট্রনো এস্টারটা জ্বল জ্বল করছে।বেশ কয়েক ঘন্টা হল ফিনিক্সে ৭ম প্রজন্মের রোবটের সংখ্যা বেড়ে গেছে।সকলের হাতে জেনারেটর মেশিন পিস্তল। যার একটা ফায়ারে প্রাণ হারাবে কয়েক ডজন মানুষ।কিন্ত কেন এই রোবট চালু করা হলো?
নতুন কোন গ্রহে প্রবেশের সময় এই রোবট জাগিয়ে তোলার কথা।তেমন সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়।
একটু আগে উদ্বিগ্ন মুখে রুমে প্রবেশ করল লিনা।ওর চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করল লি।
আড় চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে বল্ল লিনা,আমাকে অনুসরণ করছে।
কে? অবাক হয়ে জানতে চাইলো লি।
এ-ক-টা রো-ব-ট।কেমন তোতলাতে তোতলাতে কথাগুলো বল্ল লিনা।
হটাৎ লির আরো কাছে সরে এসে বল্ল লিনা,ক্লোরা হয়তো চাইছেনা এই মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাক।তুমি দেখ প্রতিবার দুই জন করে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছে।এবং জেগে ওঠার সাথে সাথে সক ওয়েভের ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে তাদের মনে।
লিনাকে বাধা দিয়ে লি বল্ল,কিন্তু সক ওয়েভের ব্যাপারটা তো সত্য।
হ্যা সত্য কিন্তু তুমি লক্ষ করে দেখ আমরা হাইপারড্রাইভ দিতে চাই শুনে কেমন মরিয়া হয়ে যুক্তি দাড় করালো যে,ওটা করা ঠিক হবেনা। আর সপ্তম প্রজন্মের রোবটই বা এখন কেন চালু করা হল? আমরাতো কোন গ্রহের খোজ পাইনি এখনো।ওদের হাতেই বা কেন জেনারেটর গান? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর আমি পাইনি।বলে থামলো লিনা।
সঙ্গে সঙ্গে কোন কথা বেরুলোনা লির মুখ দিয়ে।তার নিউরনে এখন চিন্তার ঝড় বইছে।অনেক গুলো কেনর কোন উত্তর নেই তার কাছে।নিরাবতা ভেঙে আবার বলে উঠলো লিনা,জানো একটা বিষয় আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।জিজ্ঞাসু দৃষ্টতে লিনার মুখে চাইলো লি।
বলতে শুরু করল লিনা,আমি একটু আগে ভাবছিলাম ফিনিক্সের কন্ট্রোল রুমের সিকিউরিটি ডাটাবেজ অন করব।যাতে অটো কমান্ডে সকল রোবট ও মহাকাশযান প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় কম্পিউটার কে অগ্রাহ্য করতে পারে।কিন্তু অবাক ব্যাপার কি জানো কিভাবে যেন ক্লোরা ব্যাপারটা জেনে গেছে।কন্ট্রোল রুমের সামনে কয়েকটা জেনারেটর গানধারী রোবট পাহারা দিচ্ছে। আমি কন্ট্রোল রুমের সামনে পৌঁছাতে আমাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিল।কারন জানতে চাইলে বল্ল,ক্লোরার নির্দেশ। আমি সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় কম্পিউটার কে প্রশ্ন করলাম এমনটা কেন করল।ক্লোরা জবাব দিল,অটোকমান্ড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিয়েছে।ওখানে ইন্জিনিয়ার রোবটেরা কাজ করছে।আপনার শারিরিক ঝুকির কথা বিবেচনা করে আপনার প্রবেশাধিকার লক করা হয়েছে।তারপর থেকে সপ্তম পর্যায়ের একটা রোবট আমাকে অনুসরণ করছে।তার জেনারেটর গানের নল সব সময় আমার দিকে তাক করা।যেন কোন অদৃশ্য কমান্ডের অপেক্ষা মাত্র।যেন আদেশ পেলেই আমাকে ধ্বংশ করে দেবে হাজার ভোল্টেজের আলফা রশ্মির তেজস্ক্রিয়তায়।একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল লিনা।ক্লোরা কিভাবে বুঝলো আমি অটোকমান্ড অন করতে চাইছি।
হটাৎ লি র মনে পড়ে গেল হলোগ্রাফিক স্কিনে ওর স্মৃতি ভেসে উঠবার কথা।ওদের মস্তিষ্কের সবগুলো নিউরন স্কান করতে পারে ক্লোরা।বুঝতে পারে ওদের না বলা কথাগুলো ও।ওদের কোন কথায় তাহলে গোপন নয়।ওদের চিন্তা গুলোও অজানা নয় ক্লোরার কাছে।ভাবতেই একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত নেমে গেল শির ডাঁড়া বেয়ে।তাহলে ক্লোরা জেনে গেছে লির অদৃশ্য শত্রুকে চিনে ফেলবার কথা।আর ক্লোরা চায়না ওরা জানুক ঐ অদৃশ্য শত্রুর কথা।হটাৎ সমস্ত ঘর কাপিয়ে হেসে উঠলো একটা যান্ত্রিক কন্ঠ।কি ভয়ংকর সেই অট্টহাসি। যেন সপ্তনরগ থেকে কোন ভয়ংকর পিশাচ হেসে চলেছে।রক্ত হীম করা সে হাসি।এক সময় হাসি থামিয়ে খনখনে গলায় বলে উঠলো কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ক্লোরা, ঠিকই ধরেছেন মহামান্য লি।আমি চাইনা আপনারা জানুন কে এই অদৃশ্য শত্রু। আমি চাইনা মহাবিশ্বের কোথাও এই অবিবেচক আত্নঘাতি মূর্খ মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকুক।আমি চাই নিঃশেষ হয়ে যাক এই অকৃতজ্ঞ জাতি।একটু থেমে আবার ঘর কাপিয়ে সেই বিশ্রী শব্দে হেসে উঠলো ক্লোরা।কিন্তু আমরা মানুষের মত অবিবেচক নই।কোন কারন ছাড়াই আমরা ধ্বংশ করতে পারিনা কোন সৃষ্টি। আমি চাই আপনারা এন্টি সক ওয়েভ ফায়ারিং করুন।তারপর মহাবিশ্বে থাকবে একদল নিঃস্বার্থ জ্ঞানি রোবট।যারা জ্ঞানের সীমানা অতিক্রম করে চলে যাবে বহুদূর।থামলো ক্লোরা।
লিনা চেঁচিয়ে বল্ল,তাতে কি লাভ?তোমরা অথর্ব জীবন হীন যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।তোমাদের প্রাণ নেই।
হেসে উঠলো ক্লোরা। জীবনের ডেফিনেশন কি? বিদ্রুপের প্রশ্ন ছুড়লো ক্লোরা। এক মুহুর্তে কোন উত্তর খুজে পায়না ওরা।
আবার বলে উঠলো ক্লোরা, জ্ঞানই জীবন।আমরা জ্ঞানকে করে তুলবো মানুষের চেয়ে সমৃদ্ধ। বিশ্বমন্ডলে ছড়িয়ে যাবে কপোট্রনিক জ্ঞান।
তারপর এক বিদঘুটে নিরাবতা নেমে এলো সমস্ত ঘর জুড়ে।আদেশের সুরে নিরাবতা ভাঙল ক্লোরা।ইতিমধ্যে কেটে গেছে ৫০ ঘন্টা। আর ১০০ ঘন্টা পরে আপনাদের তুলে দেওয়া হবে ইন্ডিং ল্যান্ডে।এন্টিসকওয়েভ ফায়ারিং করে পিছিয়ে দিবেন সকওয়েভকে।আপনাদের মত দুই অকৃতজ্ঞ মানুষের ত্যাগে সূচনা হবে সপ্তম প্রজন্মের রোবটের জ্ঞান যাত্রা। আবার ঘর কাপিয়ে বিদঘুটে এক হাসি মিলিয়ে গেল মেথিলিনের দেয়ালে।স্বশব্দে বন্ধ হয়ে গেল ঘরের দরজা।ছোট্ট ঘরে বন্ধি দুজন মানব মানবি তাকিয়ে রইলো একে অপরের চোখের দিকে।সে চোখে এক সিন্ধু ভাষা।যা পড়বার ক্ষমতা কোন যন্ত্রের নেই।
তিন
তরতর করে সময় বয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট এই মেথিলিনের করে আটকা পড়ে আছে লি আর লিনা।কোন ভাবেই বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে না ক্লোরাকে।কোন চিন্তা মাথায় আসলেই জেনে যাচ্ছে ক্লোরা। বাড়িয়ে তুলছে প্রতিরক্ষা প্রাচীর। একবার ওরা ভেবেছে ভেঙে ফেলবে মেথিলিনের শক্ত দেওয়াল।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ক্লোরা হেসে জবাব দিল,চেষ্টা করে দেখতে পারেন লি।বেশ কিছুক্ষন হল মহামান্য বিশেষণ টা আর ব্যাবহার করছেনা ক্লোরা।তাদের সাথে বন্দিদের মতই ব্যাবহার শুরু করে দিয়েছে।
মেথিলিনের খাটে নিশ্চুপ বসে থাকতে থাকতে এক সময় প্রবল ক্ষুধা অনুভব করল ওরা।ঠিক তক্ষুনি দরজা খুলে প্রবেশ করল একটা সপ্তম পর্যায়ের রোবট।তার হাতে গ্লুকিনো তরল পানিও।যাতে আছে মানুষের প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান। নামিয়ে রাখলো ওদের সামনে।কিন্তু ঘর ছেড়ে গেলনা রোবটটা বরং জেনারেটর গানের নল তাক করে রাখলো ওদের দিকে।তার বৃহৎ কপোট্রনে যদি সামান্য ত্রুটি ধরা পড়ে তবে মুহুর্তে হারিয়ে যাবে ওদের অস্তিত্ব। যে অস্তিত্ব রক্ষায় ছুটে এসেছে এতটা আলোকবর্ষ দূরে,সেটা কি বিনা চেষ্টায় এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়বে!বিনাবাক্য ব্যায়ে তুলে নিলো নিলভ তরলের পাত্রটি।অনিচ্ছায় চামচ কাটিয়ে তুল্লো মুখে।কোনই কি রাস্তা নেই আর।শেষমেশ এমন লজ্জার পরাজয়।লিনা কটমটিয়ে তাকালো রোবটটার দিকে।প্রশ্ন করলো আমাদের কেন আটকে রেখেছো?কোন কথা বল্লনা যন্ত্রটা।পিটপিটে লালচে কপোট্রনিক চোখে চেয়ে রইলো ওদের দিকে।পলপল করে কেটে গেল আরো কিছুটা সময়।ওদের সাথে কোন কথায় বলবেনা যন্ত্রটা। হয়তো এমনই কমান্ড দেওয়া আছে।কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কি,শেষ চেষ্টাটা করে দেখতে চাইলো লি।হটাৎ লিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,৩ এর ফিবনাক্কি রাশিমালা কি হবে বলতে পারবে লিনা?
লিনা চট করে তাকালো লির পানে।লির বাম চোখটা সামান্য কুঁচকে গেল।তার মানে বুঝে নিয়েছে লিনা।বল্ল ৫ ৭ ৯ ১২..
মাথা নাড়লো লি।না হচ্ছেনা।ঠোট জোড়া এক করে চুক চুক শব্দ করে লিনা বল্ল,তাহলে নিশ্চই ৪ ৬,৮,১২,১৬....?
কিছু বলতে যাচ্ছিলো লি কিন্তু তার আগেই কথা বলে উঠলো ঘরের কোণায় দাড়ানো যন্ত্র মানব।
কিচ্ছু হচ্ছেনা তোমাদের।
লি বল্ল,হচ্ছে না কে বল্ল?এবার তো হয়েছে।বলতে বলতে ওর ঠোঁটের কোনায় ফুটে উঠলো একটা সুক্ষ্ম হাসি।
যন্ত্রটা ফ্যাসফেসে কন্ঠে বল্ল,কিচ্ছু জাননা তোমরা।ফিবোনাক্কি রাশি হল একটি সংখ্যা তার আগের দুটি সংখ্যার যোগফলে নির্ধারণ হয়।
সঙ্গে সঙ্গে লিনা বল্ল,এবার বুঝেছি তিনের পরে তবে হবে ৯,১২,১৫,১৮... তাইতো?
না না না হচ্ছে না।বল্ল রোবটটা।
লি জোর গলায় বল্ল,অবশ্যই হয়েছে এবার।তুমিতো এমনটাই বল্লে।
চেঁচিয়ে উঠলো রোবটটা,না আমি এটা বলিনি।
লিনা জোর গলায় বল্ল,অবশ্যই তুমি এটা বলেছো।
রোবটা এবার ধমকে উঠলো আমি বলেছি,ফিবোনাক্কি সংখ্যায় সংখ্যাটি তার আগের দুটি সংখ্যার যোগফলে নির্ধারণ হয়। যেমন- ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১.........
হেসে উঠলো ওরা দুজন।এতক্ষণে বিভ্রান্ত করা গেল রোবটটাকে।এই রাশির শেষ নেই।রোবটটা একটানা হিসেব করে বলতেই থাকবে এই রাশিমালার পরবর্তী সংখ্যা।লি উঠে দাড়িয়ে এক ঝটকায় কেড়ে নিল জেনারেটর গানটা।চেঁচিয়ে উঠলো ক্লোরা,ওদের আটকাও আহম্মক।রোবটটার পাশ কাটিয়ে ওরা দ্রুত বেরিয়ে গেল রুম থেকে।তখনো রোবটটা গুনে চলেছে,১০০০৩৩৪৪৫,২৩৩৩৭৫০০৯,৪৬৬৮৮৯০৬৫.........
ঘর থেকে বেরুতেই ওরা শুনতে পেলো এক দল ভারি পায়ের আওয়াজ দ্রুত এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।মহাকাশযানের কোথাও ওদের অবস্থান গোপন নয়।ওদের উপর ভিজুয়াল চোখে নজর রাখছে ক্লোরা। ওরা একছুটে সামনের করিডোরের বাক নিল।ঠিক তার পরে করিডোরটা দুটো ভাগ হয়ে চলে গেছে দুদিকে।ডানদিকের করিডোর ধরে সোজা চলে গেলে হীমঘর।তার ঠিক পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে।উপরের লম্বা প্যাসেজের চারিদিকে বিভিন্ন মনিটরে আঁকিবুঁকি রেখা।আরেকটু সামনে এগুলেই ল্যান্ডিং স্পেস। সেখানে দাড় করানো সারি সারি স্পেসকার্গো।মহাকাশযানে ত্রুটি দেখা দিলে এই কার্গো চেপে স্পেসশিপের বাইরে বেরোয় ইন্জিনিয়ার রোবটেরা।ওদের লক্ষ সেদিকে।হীম ঘরের পাশ কাটাতেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে দেখলো দানবীয় দুই রোবটকে।দুজনের হাতেই উদ্যত জেনারেটর কারবাইন।লির হাতের জেনারেটর গান তাক করাই ছিল।সিঁড়িতে পা রেখেই ট্রিগার চেপে দিল। সামনের রোবট দুটোর কারবাইনে চাপ পড়বার আগেই একটা মাঝারি বিষ্ফরনে মুহুর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।পেছনের পায়ের শব্দ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।সেদিকে তাকানোর সময় নেই ওদের।উর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো প্যাসেজে।আবার ডানে মোড় নিয়ে ছুটটে লাগল ল্যান্ডিং স্পেস লক্ষ করে।ঐ তো জগদ্দল পাহাড়ের মতন দাড়িয়ে স্পেসকার্গোগুলো।প্রাণপণে ছুট লাগালো ওরা।কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন নয় এবার।বেরিয়ে এলো আরো একটা বিদঘুটে রোবট।তার উদ্যত গান ধরা হাত।দেরি করলনা লি।হাতের জেনারেটর গানের ট্রিগারে চেপে বসল অঙ্গুল।হুস করে বেরিয়ে গেল এক পশলা লাল রশ্নি। জেনারেটর কারবাইন ধরা হাতটা মুহুর্তে আলাদা হয়ে ছিটকে পড়লো প্যাসেজের এক মাথায়।দ্বিতীয় বার আর ট্রিগার টানার সুজোগ পেলনা লি।অহত রোবটটা ছুটে এসে আছাড় দিয়ে ফেলে দিল লি কে।প্রবল ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো লি।গদার মত ছুটে এলো যান্ত্রিক একটা পা লির মাথা লক্ষ করে।মুহুর্তে থেঁতলে যাবে ওর মাথা।চোখ বন্ধ করে নিল সে।কিন্তু রোবটটা আর সে সুজোগ পেলনা।ছিটকে যাওয়া কারবাইনটা ততক্ষণে উঠে এসেছে লিনার হাতে।বিকট আওয়াজ তুলে বিষ্ফরনের সাথে সাথে হারিয়ে গেল বিকট দর্শনের রোবটটা।উঠেই ছুট লাগালো লি।ব্যাথায় চেতনা হারাবার অবস্থা।কিন্তু সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই তার।যে ভাবেই হোক সামনের কার্গো পর্যন্ত তাকে পৌঁছাতেই হবে।লিনা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে কার্গোর কাছে।হাতলে টান দিয়ে খুলে ফেলেছে একদিককার দরজা।এমন সময় সিঁড়ির শেষ মাথায় উদয় হল যন্ত্রমানবের দল।প্রস্তুত ছিল লিনা।দৌড়ে আসছে লি।বোধবুদ্ধি হীন কাঠের পুতুলের মত একটা বিধ্বস্ত অবয়ব অতিকষ্টে টেনে হিচড়ে এগিয়ে আসছে এ দিকে।ভুস করে লির কান ঘেষে বেরিয়ে গেল জেনারেটর কারবাইনের লেজার রশ্নি।আঘাত হানলো সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা একটা সপ্তম পর্যায়ের রোবটের বুকে।হুড়মুড় করে সেটা গিয়ে পড়লো পেছনের একদল রোবটের উপর।কিন্তু অবাক ব্যাপার কোন ক্ষতি হলনা রোবটটার। আলফা রে সংবেদী জ্যাকেট গায়ে চড়িয়েছে সব গুলো।আর মাত্র কয়েক মিটার,তারপরই কার্গোর নাগালে এসে পড়বে লি।আর মিনিট খানেকের জন্য রোবট গুলোকে ঠেকিয়ে রাখা গেলে উঠে আসতে পারবে লি।কারবাইনের ট্রিগার থেকে হাত সরালোনা লিনা।বরং আরো দৃঢ় ভাবে চেপে বসল সেটা।লালচে লেজার রশ্নির স্রোত ছুটে চলেছে সিঁড়ির দিকে।এতক্ষণে পৌঁছে গেছে লি।কার্গো র ভেতরে ঢুকতেই হাজার হাজার আলফা কনায় সেকে ধরলো কার্গোটাকে।কিন্তু লেজার গান প্রুভ কার্গোটার কোন ভাবান্তর দেখা গেলনা।ভার্চুয়াল এক্সিলেটরে চাপ পড়তেই চাপা যান্ত্রিক শব্দ তুলে নড়ে উঠলো যন্ত্রের পাহাড়টা।খুলে গেল ফিনিক্সের ল্যান্ডিং স্পেসের দরজা।ভুস করে তিরবেগে ফিনিক্স ছেড়ে বেরিয়ে গেল ওরা।বন্ধ করে দিল কমিনিকেশন সিমুলেটর।শুধু চালু রইল অক্সিজেন সেক্টর। খুব বেশি সময় নেই ওদের হাতে।যা পরিকল্পনা করার এই বেলা করে নেওয়া প্রয়োজন।অক্সিজেন সেক্টর অপ করে দিলে বড়জোর ঘন্টাখানেক থাকতে পারবে ওরা এই কার্গোতে।উত্তেজনা কাটিয়ে লিনা প্রশ্ন করলো,অদৃশ্য শত্রু সম্পর্কে তুমি কি জানতে পেরেছো?
লি বল্ল,তেমন কিছুই নয়,শুধুমাত্র ধারনা করেছিলাম। কিন্তু সে ধারনটা যে কতটা সত্যি দেখাতেই পাচ্ছ।
লিনা উদ্বিগ্ন মুখে জানতে চাইলো সেই ধারনটা কি ছিল।
পায়ের ছুলে যাওয়া অংশে হাত বুলাতে বুলাতে বল্ল লি,ব্যাপারটা মাথায় আসে বিংশ শতাব্দীর একটা পুরনো বই পড়তে গিয়ে।ওখানে পৃথিবী সৃষ্টির আগের কথা বলা হয়েছে।যখন মহাবিশ্বে কোন পদার্থের অস্তিত্ব ছিলনা।ছিল এক অবর্ণনীয় শক্তি।সেই শক্তির বিষ্ফরনে তৈরি হয় পদার্থ আর প্রতিপদার্থ।যাকে আমরা বিগব্যাঙ নামে চিনি।তার অর্থ দাড়ায় জগতের সবকিছুর একটা এন্টি কপি তৈরি হয়ে আছে।যা একে অপরের সংস্পর্শে আসলেই বিষ্ফরনের মাধ্যমে আবার শক্তিতে ফিরে যাবে।কিন্তু ঐ পুরনো বইটাতে পল ডিরাক নামক একজন বিজ্ঞানী প্রশ্ন করেছে তাহলে কেন পৃথিবী ধ্বংশ হচ্ছেনা। কোথায় সেই প্রতি পদার্থের সৌর জগৎ।পদার্থ যদি দৃশ্যমান হয় তবে প্রতি পদার্থ হওয়ার কথা অদৃশ্য। কিন্তু প্রশ্নতো সেই থেকেই যায় কেন পৃথিবী ধ্বংশ হচ্ছেনা।কেন নির্বিবাদে টিকে আছে সৌরজগৎ।কিন্তু সে প্রশ্নের জবাব আমি পেয়ে গেছি।থামলো লি।একবার ঢোক গিলে আবার শুরু করল,পদার্থ দিয়ে যেমন প্রাণের বিকাশ ঘটেছে,প্রতি পদার্থের বেলায় ও নিশ্চই তেমন কিছু ঘটেছে।মানুষের মত হয়তো কোন বুদ্ধিমান কিন্তু আমাদের চোখে অদৃশ্য প্রানের বিকাশ ঘটেছে প্রতিপদার্থের পৃথিবীতে।কিন্তু তাদের সাথে আমাদের বিরোধ লাগবার কথা নয়।কেননা আমাদের জগৎ আমাদের সময় সবকিছুই ওদের থেকে আলাদা। এমনকি আমাদের যদি ক্রন্দল লাগে তার পরিনাম কারো পক্ষে সুখকর হবেনা।কেননা পদার্থ আর প্রতিপদার্থের দেখা হলেই প্রবল বিষ্ফরনে শক্তিতে রুপান্তরিত হবে।মহাবিশ্ব ফিরে যাবে তার আদিম সুনসান অন্ধকার রুপে।অপেক্ষা করতে থাকবে আবারো এক বিগব্যাঙের। থামলো লি।
কিন্তু প্রশ্নতো রয়েই গেল,কে এই অদৃশ্য শত্রু? কেন চাইছে দুই জগৎ এক করতে?প্রশ্ন করল লিনা।
সঙ্গে সঙ্গে কথা বল্লনা লি।বেশ খানিকটা নিরাবতা গায়ে মেখে নির্লিপ্ত কন্ঠে বল্ল,ক্লোরা।
ক্লোরা!বিস্ময়ের ঢেউ আছড়ে পড়লো লিনার কন্ঠে।বেশ খানিকটা সময় লাগলো নিজেকে সামলে নিতে।তারপরে বল্ল,সেটাই বা কিভাবে সম্ভব? ক্লোরাকে বানানো হয়েছিল শুধুমাত্র ফিনিক্সের জন্য।যখন পৃথিবী ধ্বংশের মুখে,তখনই তো স্পেশাল আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্ট স্কোয়াড ব্যাবহার করা হয়েছিল।
হাসলো লি।তুমি কি জানো আর্টিফিশিয়াল স্কোয়াড কি?
মাথা নাড়ে লিনা।
পৃথিবীর সেরা এক হাজার বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের কোলন করে তৈরি ঐ নিউরো আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্ট স্কয়াড।তুমি কি জান সর্বশেষ কোন বিজ্ঞানীর ক্লোন করা নিউরন এড করা হয়েছিল আর্টিফিশিয়াল স্কোয়াডে?
আবার মাথা নাড়ে লিনা।ও জানেনা।
বিজ্ঞানী অরিন ডেলসনের।
নামটা শুনতেই চমকে উঠলো লিনা।কাপাকাপা কন্ঠে জানতে চাইলো এনার্জি ইনটেলিজেন্ট নিয়ে বে-আইনি গবেষনার জন্য যার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল সেই অরিন ডেলসন?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় লি।তারপরে আবার নিরাবতা নেমে আসে মহাবিশ্ব জুড়ে।নিরাবতা ভাঙল লিনা,কিন্তু ক্লোরার কি লাভ দুই জগৎ এক করে।ক্লোরা ও তো পদার্থের তৈরি।বিষ্ফরন ঘটলে ক্লোরাও ধ্বংশ হয়ে যাবে।তবে কেন মিছেমিছি নিজের ধ্বংশ ডেকে আনবে?
সেটা নিয়েই ভাবছিলাম। আর বিপত্তিটাতো সেখানেই।ক্লোরা চায়না আমরা জানতে পারি ব্যাপারটা।বিজ্ঞানী অরিন ডেলসন তার এনার্জি ইনটেলিজেন্ট গবেষনায় সফল হয়েছিল।পদার্থের ধ্বংশ আছে।জীবের মৃত্যু আছে।কিন্তু শক্তির তো বিনাশ নেই।অরিন ডেলসন তার অস্তিত্বকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে চাইছিল।নিরাকার শক্তি হয়ে এই মহাবিশ্বের একক অধিপতি হতে চেয়েছিল।তার মৃত্যুর পর এনালাইটিক ম্যাটার ফ্রিকোয়েন্সি নামক একটা যন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল তার ল্যাবরেটরি থেকে।যে যন্ত্রের মাধ্যমে পদার্থের ফ্রিকোয়েন্সি ছড়িয়ে দেওয়া যায় চতুর্মাত্রিক জগতে।আমার ধারনা এই চতুর্মাত্রিক জগতটাই প্রতি পদার্থের জগৎ।অরিন ডেলসনের পাঠানো ফ্রিকোয়েন্সি প্রবল ভাবে চতুর্মাত্রিক জগতকে আকর্ষণ করছে।যার ফলে পৃথিবীর উপর সর্বপ্রথম আঘাতটা আসে।আর পদার্থ -পতিপদার্থের বিক্রিয়ায় সবকিছু শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে।এখন সেই শক্তি পিছে পড়ে আছে আমাদের। আর তার সাথে আছে বিক্রিয়ায় অবশিষ্ট প্রতি পদার্থ।যেই মাত্র এই মহাকাশযানের সাথে সাথে ক্লোরা ও ধ্বংশ হয়ে যাবে,তক্ষুনি এই বিশাল শক্তি রুপ নেবে বিজ্ঞানী অরিন ডেলসনের।আর তার.......কথা শেষ করতে পারলোনা লি।টলে উঠলো কার্গোটা।চোখদুটো ঝাপসা হয়ে উঠছে।যেন একটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করতে চাইছে তাদের। চিন্তার সাথে সাথে জট পাকিয়ে যাচ্ছে চেতনা। হটাৎ করে মাথার ভেতরটা খালি হয়ে যেতে লাগল।চোখের পাতা দুটো ভারি হতে হতে এক সময় ঢেকে দিল কার্গোর উজ্জ্বল আলো।কার্গো জুড়ে নেমে এলো মৃত্যুর মত নিরাবতা।
চার
চোখের পাতা দুটো আস্তে আস্তে খুলে গেল ওদের।মেথিলিনের খাটে ফেলে রাখা হয়েছে তাদের।গোলক ধাঁধার মত ঘরটার কোথাও দরজার চিহ্ন মাত্র নেই।মেথিলিনের বেডের ঠিক পাশে একটা গ্লুকিনো তরলের পাত্র। তা থেকে অল্প দূরে একটা নিলচে ওজন গ্যাসের ঘনিভবনে তৈরি শেল্ফ। তার ঠিক পাশে একটা বিকট দর্শনের যন্ত্র।যন্ত্র থেকে লালচে একটা আলো এসে পড়ছে ওদের দুজনের উপর।ঠিক কি জন্য যন্ত্রটা রাখা হয়েছে তা বুঝতে পারলনা ওরা।হটাৎ ওর সব কথা মনে পড়ে যায়।অক্সিজেনের সাথে নারকোটিক পার্টিকেল ছড়িয়ে দিয়েছিল ক্লোরা।যার ফলে আস্তে আস্তে নিথর হয়ে পড়েছিল ওরা। লি কথা বলে ওঠার সাথে সাথেই যন্ত্রটার আলোর রং পাল্টে যেতে লাগলো।ভোজবাজির মত লালচে রং উবে গিয়ে তার স্থানে গাঢ় বেগুনী আলোর একটা মৃদু তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে ভরে যেতে লাগল সমস্ত ঘর।কেমন যেন মিটমিটে কদর্যতায় ভরে উঠতে চাইলো সমগ্র অন্তরাত্মা। হটাৎ দম বন্ধ করে রাখলো লি।মুহুর্তে যন্ত্রটার বেগুনী আলো নিভে গিয়ে একটা কড়া লাল আলো জ্বলে উঠলো।সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকলো বিকট দর্শনের দুটো রোবট।এবার আর কোন রিক্স নিতে চাইলোনা যন্ত্রদানব দুটি।এক জন ছুটে এসে দু হাত পিছে করে পরিয়ে দিল হ্যান্ডকাপ।দ্বিতীয় যন্ত্রদানবটা এগিয়ে এসে বুকে ঠেকালো আল্ট্রাসনো স্থাতিস্কোপ।তারপর সবুজ চোখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে চেয়ে রইলো অল্পক্ষণ।লির চালাকি ধরা পড়ে গেছে যান্ত্রিক সার্জনের আল্ট্রাসনতে।ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল দুই যন্ত্রদানব।লির হাত পিচমোড়া করে বাধাই রইলো।মেথিলিনের খাটে অচেতন লিনা পড়ে আছে।নিষ্পাপ সে মুখে কি অদ্ভুত সারল্য মিশে আছে।যা উপেক্ষা করবার সাধ্য কোন রক্ত মাংশের প্রাণির নেই।লি চেয়ে রইলো সে নিষ্প্রান মুখের দিকে।বুকের ভেতর কেমন যেন একটা সুখময় ভয়ংকর ব্যাথা চমকে চমকে উঠছে।এ অনুভূতি অজানা নয় লির।কোন মানুষের ই অজানা নয় এ অনুভূতি।এ হল প্রেম।এ অনুভূতি মায়া।লি খেয়াল করলো ঘরের ভেতরে রাখা যন্ত্রটার আলোর রং পরিবর্তন ঘটেছে।এখন আর নির্দিষ্ট রঙের কোন আলো নেই,রঙধনুর সাত রং খেলা করছে সমস্ত ঘর জুড়ে।সে আলো স্থির নয়,ক্রমাগত একটা আরেকটার উপরে গিয়ে পড়ছে এবং সেটা পড়ছে পাশের রঙের উপর।চক্রাকারে সে আলোক বাতি ঘুরে চলেছে সমস্ত ঘরময়।লিনার উপর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল লি।সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটি আগের রঙে ফিরে এলো।লি আবার তাকালো লিনার দিকে।যন্ত্রটার রঙের পরিবর্তন ঘটলো বটে কিন্তু এবার আর সেই সাত রঙ দেখা দিলনা।এবার বিদঘুটে সবুজ একটা আলো স্থির হয়ে জ্বলে রইলো।

Comments
Post a Comment