চিঠি


 চিঠি 
লেখকঃরোকনুজ্জামান

কাটখোট্টা রোদ।বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি ঘন্টাখানেক হল।এই যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে আমার কাছে একটা চিঠি এসেছিল,মাস চারেক আগে।চিঠিটা দেখে যতটা অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলাম চিঠিটা লিখেছে মোহনা নামের কেউ।চিঠিটার ভাষাগুলো এমন ছিলঃ প্রিয় অচেনা। জানিনা প্রিয় বলাটা আমার ঠিক বা ভুল কোন পর্যায়ে পড়েছে।তবুও প্রিয় সম্ভাষণ টা করলাম।চিঠি লিখতে আমার বড় ভালো লাগে।কিন্তু শব্দ খুঁজে পাইনা। শব্দরা বড্ড চতুর, আমার কলমে ওরা ধরাই দিতে চায়না।জানো,সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ দেখেছি। চোখের নিচে হটাৎ কালি পড়া শুরু করেছে।বাবা বলে আমি নাকি জগতের শ্রেষ্ঠ রূপসী। মাঝে মাঝে আমার খুব অহংকার করতে ইচ্ছে করত।কিন্তু অহংকার বুঝি আমার সাজে না। সেদিন ছিল রোববার,আমাদের বাসায় একটা চিঠি এসেছিল। খুব আনন্দ নিয়েই চিঠিটা খুলেছিলাম। বেলকনির দোলনা তে বসে পা দোলাতে দোলাতে  পড়া শুরু করেছিলাম। প্রথমেই লেখা আমার নাম।বয়স সতের।পাঠিয়েছেন ডক্টর আফজাল আংকেল। গতমাসে যে টেস্ট গুলো করিয়েছিলাম সেগুলোই।তার মাঝেই পেয়েছিলাম একটা চিঠি। চিঠিটা বাবাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ছিল। "অনিল তোমাকে কথাটা এসে বললে পারতাম। কিন্তু আমার পক্ষে সেটা সম্ভবনা।কেননা কথাটা শুনবার পর তোমার মুখের দিকে তাকানোর ক্ষমতা বিধাতা আমাকে দেয়নি। গতমাসে মোহনার রিপোর্টগুলো দেখে আমিও এতটা বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলাম। এখন তুমি যতটা বিমর্ষ হয়েছো।মোহনার মাথায় ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। "

বিশ্বাস করো চিঠিটা পড়ে আমার একদম খারাপ লাগেনি। কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছিল বাবার জন্য। আমাকে খুব ভালোবাসে বাবা। সেই ছোটবেলায় আমাকে আর বাবাকে রেখে মা ঐ আকাশে পাড়ি জমিয়েছিল। সেই ছোট থেকে বহু চিঠি লিখেছি মায়ের কাছে। কিন্তু একটাও চিঠির উত্তর আসেনি। ছোট থেকেই আমি কত অজানা ঠিকানায় চিঠি লিখেছি, কিন্তু মিথ্যা করেও কেউ তার জবাব পর্যন্ত দেয়নি। বাবা আমার বড় বন্ধু। বাবা বলে দেখিস একদিন চিঠির জবাব আসবে।কোন এক রাজপুত্র এসে নিয়ে যাবে আমার পরিটা কে। সেদিন আমার এই পরিটা কে সুন্দর করে সাজাবো আমি নিজ হাতে।জানিনা সে রাজপুত্র আর কখনো আসবে কিনা। কেননা আমি আর এই পৃথিবীতে আছি মাত্র কয়েকদিন। 

আফজাল আংকেলের সে চিঠিটা সেদিন আমি ছিড়ে ফেলেছিলাম। বাবা জানতেও পারেনি তার পরিটা আর এই পৃথিবীতে কয়েক দিনের অতিথি মাত্র। জানিনা আমার এই চিঠিটার একটা জবাব  আসবে কিনা। এই চিঠিটা যদি তোমার হাতে পড়ে তবে মিথ্যা করে হলেও একটা চিঠি  দিও।ইতি মোহনা।

চিঠিটা পড়ে আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। আমার কি করা উচিত কিছুতেই যেন বুঝে উঠতে পারছিলামনা।তারপর তারপর খাতা কলম নিয়ে বসে পড়েছিলাম চিঠিটার উত্তর লিখতে। গতকাল রাতে চিঠিটা শেষ করে  ডাকে পাঠাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু মোহনার চিঠির তারিখটা চার মাস আগের। ডাকে পাঠালে দেরি হয়ে যেতে পারে তাই নিজেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এমন সময় একটা বাস এসে থামলো। উঠে পড়লাম। না জানি মেয়েটা কতটা খুশি হবে।অন্ততঃ একটা চিঠির জবাব তো সে পেয়েছে। সন্ধার কাছাকাছি সময়ে হিজলতলী বাসস্ট্যান্ডে বাস থামলো।বাস থেকে নেমেই একজনকে জিজ্ঞেস করালাম, এখানে অনিল সাহেবকে চেনেন?

লোকটা বললঃ কোন অনিল সাহেব আমাদের বড় বাবুর কথা বলছেন?

আমি কিছু না-বুঝে মাথা নাড়লাম। 

লোকটা আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল একটু দূরের ঐ মোড়টা পেরোলেই যে জমিদার বাড়িটি চোখে পড়বে সেটাই  অনিল সাহেবের বাসা।হাঁটা শুরু করলাম। বুক পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিলাম চিঠিটা ঠিক আছে কি-না। বাড়িটা বড্ড নিরিবিলি। কোন জনমানবের চিহ্ন যেন কোন কালেই ছিলনা এখানে। হটাৎ করে বুকের ভেতরে ধক করে উঠলো এক অজানা আশঙ্কায়। বাড়িতে ঢুকে কাউকে খুজতে হলনা। সিঁড়ির পরে একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে এক মাঝ বয়সী লোক বসে আছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, এটা কি মোহনা দের বাড়ি?লোকটা চট করে আমার দিকে তাকাল। তারপর বললঃ হ্যা।

আমি বললাম, ওকে একটু ডেকে দেওয়া যাবে? 

লোকটা ঠান্ডা কন্ঠে বললঃ না।

আমি বললামঃ ওর একটা চিঠি ছিল। 

লোকটা এবার বললঃ এসো আমার সাথে। লোকটা আমাকে নিয়ে হাঁটছে একটা নদীর পাড় ঘেঁষে। হয়তো মোহনা সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছে।আরেকটু এগোতেই চোখে পড়লো শ্মশান। 

লোকটা আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল ঐ আমার পরি।দাও।চিঠিটা ওকে দিয়ে দাও।সেই এলে আরেকটা দিন আগে আসতে পারলেনা?শেষের দিকে লোকটার কন্ঠ টা কেমন দুমড়ে এলো কান্নায়।হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো ভেজা মাটিতে। আমি এগিয়ে গেলাম শ্মশানের দিকে। নিভু নিভু চিতার আগুনে ছুড়ে দিলাম চিঠিটা।সরে এলাম চিতার পাশ থেকে। আকাশে তখন কালো ধোঁয়া অস্তমিত লাল সূর্য কে ঢেকে ফেলেছে। সেই কালোর মাঝে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম একটা পরি।তার চোখেমুখে স্পষ্ট খুশির ছাপ। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশে। আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম। 

Comments

Popular posts from this blog

পূর্ণিমা

অস্তিত্ব