অগাধ ভালোবাসা
অগাধ ভালোবাসা
লেখকঃশিরিন আফরোজ
(ফার্মেসি ডিপার্টমেন্ট মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি)
বেলা পৌনে বারোটা বাজতে চললো,কিন্তু বাইরে ছিটেফোঁটা রোদ টুকু ও নেই।তীব্র কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ। এই কনকনে শীতের মধ্যেই গায়ে পাতলা একটা চাদর জড়িয়ে বের হয়ে গেলো নিশাত। মেয়েটা বড্ড বেশী আলসে,লেপ মুড়িয়ে নিজের খাটেই হয়তোবা সে ঘুমিয়ে থাকতো অথবা মায়ের বকুনি শুনে আধো ঘুমে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে মায়ের হাতের বানানো গরম ধোঁয়া উঠা এক কাপ চা খেতে খেতে বারান্দায় পায়চারি করত এই সময়টাতে।কিন্তু আজ এসব কিছুই হলোনা। খুব তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে উঠেই সে বেরিয়ে গেলো।আজকে খুব জরুরী একটা কাজ তার। বাস স্ট্যান্ডে এসে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কাঙ্খিত বাসে উঠে পড়লো নিশাত। গন্তব্য পৌছানোর পর দেখলো একজন সুদর্শন লোক দুরে একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে দেখা করাটাই আজকের দিনে সবচেয়ে জরুরী কাজ ছিলো। নিশাতের চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।ওই মুখ তার জন্মান্তরের চেনা। কি এক অপূর্ণ মায়া ঘুরে ফেরে ঐ মুখে।কিছুদূর এগিয়ে গিয়েই নিশাত তার দুটো হাত দিয়ে সেই ভদ্রলোকটির চোখ ধরে ফেলল। ভদ্রলোক হাত দুটো নিজের চোখ থেকে সরাতে সরাতে বললো,পাক্কা পঁচিশ মিনিট দেরী করে আসলে তুমি। নিশাত: তাও ত আসলাম ।তুমি জানো আমার প্রিয় ঘুম বাদ দিয়ে, আমি তোমার সাথে দেখা করার জন্য মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে টুক করে বের হয়ে ছুটে এসেছি।
লোকটা মৃদু হেসে বললঃ তোমার মায়ের কাছে তুমি যতই ফাঁকি দাওনা কেনো দিনশেষে সে কিন্তু সব ই বুঝে নিবে, বলতে বলতে লোকটার কন্ঠ টা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল।চোখ দুটো বার দুয়েক কেঁপে কেঁপে উঠলো।
নিশাত কথা চাপা দেওয়ার জন্য বলল সেটা ঠিক ..নিলে নিবে। এখন তুমি বলো কেমন আছো? কেমন যাচ্ছে সব কিছু? প্রশ্নটা শুনে লোকটার কোন ভাবান্তর হলনা,খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, প্রশ্ন টা খুব ই সাধারণ এবং সহজ। কিন্তু এই সহজ প্রশ্নের উত্তরটা আমি যে দিতে পারছিনারে মা। তারপর নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে গাঢ় স্বরে বলল, ওসব থাক তুই বরং আমাকে বল, তোদের দিন কেমন যাচ্ছে? তোরা ভালো আছিস তো ? আচ্ছা তোর মা কি এখনো রোজ সকাল বেলায় নিয়ম করে চা বানায়?এখনো কি তোকে বকুনি দিয়ে ঘুম থেকে উঠায়? এখনো কি সেই আগের মত চুলায় দুধ দিয়ে ভুলে যায় সে? পরে এসে যখন দেখে সব দুধ নাই হয়ে গেলো তখন কি থমথম করতে থাকে? যে কেউ এসে চুলোর পার টা কেন দেখে গেলো না! বলে নাকি এখনো ? নিশাত বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে,তার বলতে ইচ্ছে করে না বাবা এখন আর কিচ্ছু আগের মত নেই।তুমি নেই বলে বেলকনি-টাও ফাঁকাফাঁকা। কিন্তু সে এসব কিছুই বলতে পারেনা।শুধু নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,বাবা আমিও তো তোমার মেয়ে তাই না! তোমার এ সব প্রশ্ন গুলো অনেক সহজ বটে কিন্তু আমি যে উত্তর গুলো দিতে পারছিনা।
নিশাতের বাবা নিলয় সাহেব কিছু বলতে পারল না।চোখ দুটো নামিয়ে নিলো ধূলো তে।পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে নিশাত বলে ওঠে, তুমি জানো এখনো আমি কিছুই খাইনি সকাল থেকে।আর তুমি কিনা পরিক্ষা নেওয়ার মত প্রশ্ন করেই যাচ্ছ। চলো ত বাবা কিছু খাব। উমম..কিছুনা বরং অনেক কিছুই খাব। নিলয় সাহেবের মুখে পিতৃ সূলভ একটা হাসি ফুটে ওঠে, হ্যা হ্যা ,খাবি ত মা। এক কাজ কর। একটু এদিকে আয় তো মা...ঐ যে.. ঐখানে যেয়ে একটু বসি। বাবা,মেয়ে একটু খানি হেটে সামনে যেয়ে বসলো। নিশাত এর মনে হলো এই জায়গাটাতেই বাবা আর মা খুব বেশি সময় কাটাতো। বাবা....তুমি এখানে বসে গেলা কেনো? আমরা এখন কোথাও যেয়ে খেয়ে আসি চলো। হুম খাবো মা।
কিছুক্ষন পর একটা ব্যাগ থেকে তিন টি বক্স বের করে মেয়ের সামনে রাখলেন নিলয় সাহেব। এই নে মা খুলে দেখ...
বক্স দেখে নিশাত খুব অবাক হয়।কিন্তু কথা না বাড়িয়ে বক্স গুলি খুলতে লাগলো ।একটি বড় বক্সে খিচুড়ি,অন্য আরেকটি বক্সে বেগুন ভাঁজা,আর শেষ বক্সে ডিম ভাঁজা।নিশাতের চেহারায় আনন্দের এক আভা ফুটে উঠলো।এত আনন্দ যে চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। নিশাত জানে এগুলো তার খুব পছন্দ, এই পছন্দ টা বাবার থেকেই পেয়েছে সে। কেননা বাবার এই খাবার গুলি খু্ব বেশী পছন্দ।বাবা তাকিয়ে আছে, মেয়ের আনন্দ টাকে উপভোগ করছে। আজ সকালে তিনিও ঘুম বাদ দিয়ে ,উঠে অনেক সময় ব্যায় করে এই খাবার গুলো রান্না করেছেন।তারা খেতে শুরু করলো। খেতে খেতে অনেক গল্প হলো। খাওয়া শেষ হওয়ার পর নিশাত এর মা নিশাত কে কল করলো। নিশাত একটু দূরে গিয়ে কল টা ধরলো। নিশাত তুই বাসায় কখন আসবি? মা, এইতো ঘন্টা দুয়েক পর। বাসায় আসার সময়, বাজার থেকে সুন্দর সুন্দর দেখে বেগুন আনবি। আজ রাতে বেগুন ভাজবো । আর শুন ঘরে না ডিম ও শেষ নিশাত। তুই ডিম ও নিয়ে আসিস। আমি খিচুড়ি রান্না করব ভাবতেছি। খাবি ত নাকি অন্য কিছু রান্না করব?? হ্যা মা খাবো । কেন খাবো না?আচ্ছা তাহলে মনে করে নিয়ে আসিস। জ্বী আচ্ছা মা বলে নিশাত ফোন টা রাখলো। নিশাত এর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। চোখ টা বন্ধ করে নিশাত মনে মনে ভাবলো, এই পৃথিবীর সব কিছু এত্ত জটিল কেনো? সব সহজের ভিতরই বুঝি এরকম জটিলতা ঘিরে থাকে। কেনো আমার করা সহজ প্রশ্নের উত্তর বাবা আজ দিলো না? কেনো বাবার করা সহজ প্রশ্নের উত্তর গুলো আমি দিতে পারলাম না?কেনো দুটি বছর আগে বাবা মায়ের আলাদা হওয়ার ঠিক তথ্য টা আমি জানিনা? আজ তারা দুইজন দুই মেরুর মানুষ।কিন্তু অভ্যাস এবং মায়ার জাল মানুষ কে খুব বেশিই আগলে রাখে মনে হয়। চোখ মুছে বাবার কাছে আসলো নিশাত। বাবার দিকে তাকিয়ে নিশাত বললো শুনো বাবা;আমি কিন্তু এভাবে আর লুকোচুরি করে দেখা করতে আসতে পারবো না বলে দিলাম। এই যে কত কি মিথ্যা কথা বলতে হলো মাকে। খোজ খবর নেওয়ার জন্য মা কল দিলো,আর আমি দিব্যি মিথ্যা কথা টথা বলে রেখে দিলাম। বাবা জানো,আজ মা....আচ্ছা বাদ দাও...এখন তাহলে উঠি। বাবার সাথে চা ও খেলো নিশাত, হাটতে হাটতে আইস্ক্রিম ও খেলো।বাবার গাড়ী দিয়ে চাইলেই নিশাত বাসায় আসতে পারতো । কিন্তু ,নিশাত উঠে গেলো বাসে,পরক্ষণেই সে আবার বাস থেকে নেমে,জোরে করে বাবা বলে ডাক দিলো,বাবা শুনো।হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে বুঝাল তাড়াতাড়ি আসো বাবা বাস ছেড়ে দিবে। বাবার হাতে একটি প্যাকেট দিয়ে, শুভ জন্মদিন বাবা বলে বিদায় নিলো নিশাত। বাস চলতে থাকলো বাসার উদ্দেশ্য। আজ রাতে বাসায় মা ও বাবার পছন্দের খাবার রান্না করবে। আমাকে বাজার করে নিতে হবে.........সময় যাচ্ছে, সম্পর্ক গুলো মলিন হচ্ছে ধুলো মাখা বইয়ের মতো । একটু ফু দিয়ে ধুলো গুলো না উড়ানোর চেয়ে যত্ন করে বই গুলো মুছে রাখলে যেমন বইতে ধুলো জমেনা তেমনি সম্পর্ক গুলোকে ও যত্ন করে মুছতে হয়, তাহলে খুব বেশী একটা মলিন হয়না। কিন্তু আমি কেনো জানি এই মলিন হওয়া সম্পর্কেও অনেক বেশী কিছু দেখছি,.... অনেক বেশী।। এটা কি আমার ভ্রম? কেনো জানি মনে হয় এই মলিন হওয়া সম্পর্কের আড়ালেও লুকিয়ে আছে অযত্নে রাখা এক অগাধ ভালোবাসা।

Comments
Post a Comment